স্থান সমুহ

মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

Featured Image

এজেন্ট গার্বো: হিটলারকে ধোঁকা দিয়েছিল যে রহস্যময় স্প্যানিশ গুপ্ত। 

স্পাই বা গুপ্তচর শুনলেই আমাদের কল্পনার দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে মাসুদ রানা অথবা জেমস বন্ডের মতো কারো চেহারার বর্ণনা। আমাদের অনেকেরই ধারণা, স্পাই হবে সুদর্শন, ছয় ফিট লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী কোনো যুবক। সে শুধুমাত্র কারাতে এবং জুজুৎসুতেই অসম্ভব দক্ষ হবে না, বরং একই সাথে তার থাকবে কয়েক ডজন ভাষার উপর অগাধ জ্ঞান, এবং সে হবে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে শুরু করে গাড়ি, প্লেন, হেলিকপ্টার সহ সব ধরনের যানবাহন চালানোয় অসম্ভব রকমের পারদর্শী।
হুয়ান পুহোল গার্সিয়া; Source: The National Archives
কিন্তু হুয়ান পুহোল গার্সিয়ার মধ্যে এ ধরনের কোনো গুণাবলিই ছিল না। তিনি ছিলেন মাঝারি উচ্চতার, অনাকর্ষণীয় চেহারার এবং মাথায় আংশিক টাক বিশিষ্ট খুবই সাধারণ একজন ব্যক্তি। গোয়েন্দাগিরি বিষয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছিল না। কোনো ধরনের বিশেষ দক্ষতাও তার ছিল না। এমনকি তিনি তার মাতৃভাষা স্প্যানিশের বাইরে ইংরেজিটাও ভালো করে জানতেন না। কিন্তু শুধুমাত্র অসম্ভব বুদ্ধিমত্তা এবং লাগামহীন কল্পনাশক্তির সাহায্যে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডাবল এজেন্ট হিসেবে তিনি ঠাঁই করে নিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়।
পুহোলের তৈরি করা অবিশ্বাস্য রকমের জটিল এবং বিস্তৃত কাল্পনিক গোয়েন্দা জগতের রিপোর্টগুলো ধোঁকা দিতে সক্ষম হয় স্বয়ং হিটলারকেও। তার অপারেশন ফোর্টিচিউড এর ধোঁকায় পড়ে হিটলারের কমান্ডার ইন চিফ, ফিল্ড মার্শাল রান্ডস্টেডজার্মান বাহিনীর ২১ ডিভিশন সৈন্যকে নিযুক্ত করে রাখেন অন্য জায়গায়। আর এর ফলেই মিত্র বাহিনীর পক্ষে বিখ্যাত ডি-ডে‘র অপারেশনে নরম্যান্ডি বিচে জার্মানদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা সম্ভব হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা পায় তার কূট কৌশলের কারণে। আর এসবই তিনি করেন শত্রু পক্ষের মনে কোনো রকম সন্দেহের উদ্রেক না ঘটিয়েই। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খুবই স্বল্পসংখ্যক গুপ্তচরের মধ্যে একজন, যিনি একই সাথে ব্রিটিশ এবং জার্মান, দুই পক্ষের কাছ থেকেই বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন।

কে ছিলেন এই হুয়ান পুহোল গার্সিয়া?

যুবক বয়সী হুয়ান পুহোল গার্সিয়া; Source: Tamara Kreisler
হুয়ান পুহোল গার্সিয়া ছিলেন স্পেনের কাতালুনিয়ার বার্সেলোনার অধিবাসী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন নির্ঝঞ্ঝাট, নিরুপদ্রব ধরনের মানুষ। ত্রিশের দশকে যখন স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ভয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার প্রেমিকার বাসায় আত্মগোপন করে ছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত রিপাবলিকান পক্ষের হাতে ধরা খেয়ে তাকে যুদ্ধে যোগ দিতে হয়েছিল। রিপাবলিকান দলের প্রতি পুহোলের আগে থেকেই বিতৃষ্ণা ছিল, কারণ তাদের হাতে তার মা, বোন এবং বোনের প্রেমিক হয়রানির শিকার হয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে তাদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলেও তিনি সবসময় পালানোর সুযোগ খুঁজছিলেন।
১৯৩৮ সালে রিপাবলিকানদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধের ময়দানে টেলিগ্রোফের তার বসানোর সময় সুযোগ বুঝে পুহোল পালিয়ে গিয়েন্যাশনালিস্টদের পক্ষে যোগদান করেন। কিন্তু ন্যাশনালিস্টদের হাতেও তিনি একই রকম নিগৃহীত হন। তাদের ফ্যাসিস্ট মনোভাবও পুহোলের পছন্দ হচ্ছিল না। নিজের মতামত প্রকাশ করায় তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি গ্রেপ্তার বরণ করেন। ফলে পুহোলের মধ্যে একই সাথে কমিউনিজম এবং ফ্যাসিজম- উভয় মতাদর্শের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়, যে বিদ্বেষ পরবর্তীতে যথাক্রমে বৃহত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং নাৎসি জার্মানী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার এ ধরনের মনোভাবই তাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জার্মানীর বিপক্ষে গোয়েন্দাগিরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

জার্মান গোয়েন্দা হিসেবে যোগদান

হুয়ান পুহোল গার্সিয়া তথা এজেন্ট গার্বো; Source: The National Archives
স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের পর পুহোল যখন সবেমাত্র তার পুরানো মুরগির খামারটি বন্ধ করে মাদ্রিদে একটি নিম্নমানের একতারকা হোটেলের ব্যবসা চালু করে কোনো রকমে দিন অতিবাহিত করার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হিটলারের সেনাবাহিনী একের পর এক ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো দখল করে নিতে থাকে, আর জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সম্মতিতে স্পেন হয়ে উঠতে থাকে নাৎসি বাহিনীর গুপ্তচরদের অন্যতম প্রধান অভয়ারণ্য। সে সময় ব্রিটেন ছিল জার্মানীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো ইউরোপের একমাত্র সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। পুহোল সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও মানবতার বৃহত্তর কল্যাণে তাকে হিটলারের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে হবে।
১৯৪১ সালে পুহোল মাদ্রিদে অবস্থিতব্রিটিশ দূতাবাসে যান এবং ব্রিটিশদের হয়ে জার্মান গোয়েন্দাদের উপর পাল্টা গোয়েন্দাগিরি করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু পুহোলের চেহারা, শারীরিক গঠন, শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতা, কোনো কিছুই গোয়েন্দা হওয়ার উপযুক্ত ছিল না। ফলে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা হাসতে হাসতেই তাকে দূতাবাস থেকে বের করে দেন। তাদের জানার কথা ছিল না, মাত্র এক বছরের মধ্যেই এই আপাত অযোগ্য লোকটিই হয়ে উঠবে হিটলারকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্রিটেনের সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। তার শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার অবিশ্বাস্য সব কৌশল এবং শত্রুর বিশ্বাস অর্জন করার অসাধারণ দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বোরনামানুসারে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা তার ছদ্মনাম দিবে এজেন্ট গার্বো!
হুয়ান পুহোল গার্সিয়া তথা এজেন্ট গার্বো; Source: The National Archives
পরপর তিনবার চেষ্টা করেও ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাত্তা না পেয়ে পুহোল সিদ্ধান্ত নেন, তিনি জার্মান গোয়েন্দা বাহিনীতে যোগ দিবেন। এরপর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে সাহায্য করবেন ব্রিটিশদেরকে। তিনি যেচে পড়ে এক স্প্যানিশ কূটনীতিবিদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। এরপর একদিন সুযোগ বুঝে তাকেপানীয় এবং চিপস খেতে দিয়ে তার রুমে গিয়ে তার পাসপোর্ট এবং কূটনৈতিক কাগজপত্রগুলো ফটোকপি করে ফেলেন। পরে সেগুলো দেখিয়ে ভুয়া পরিচয় দিয়ে কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করে ফেলেন। স্প্যানিশ কূটনীতিবিদের ছদ্মবেশ ধরে পুহোল মাদ্রিদের জার্মান দূতাবাসে যান এবং নিজেকে নাৎসি ভক্ত হিসেবে পরিচয় দেন। সেখানে তিনি ফ্রেডেরিকো নামে এক জার্মান গোয়েন্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।
পুহোল তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট-ভিসা দেখিয়ে এবং উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সাথে তার বন্ধুত্বের কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে ফ্রেডেরিকোকে এমনভাবে মুগ্ধ করে ফেলেন যে, ফ্রেডেরিকো তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি পুহোলকে গুপ্তচরবৃত্তির উপর একটিসংক্ষিপ্ত কোর্স করান, যার মধ্যে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার সহ বিভিন্ন মৌলিক দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোর্স সমাপ্তির পর ফ্রেডেরিকো পুহোলকে সাংকেতিক ভাষার একটি কোড বই, গোপন বার্তা লেখার জন্য এক বোতল অদৃশ্য কালি ও নগদ ৬০০ পাউন্ড দেন এবং ইংল্যান্ডে গিয়ে তার বিশ্বস্ত ব্যক্তিদেরকে নিয়ে গুপ্তচরদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দেন। জার্মান গোয়েন্দাবাহিনীতে পুহোলের ছদ্মনাম দেওয়া হয় অ্যালারিক অ্যারাবেল (Alaric Arabel)।

ডাবল এজেন্ট হিসেবে পুহোলের তৎপরতা

গার্বোর কাল্পনিক এজেন্টদের নেটওয়ার্ক; Source: The National Archives
ভুয়া পরিচয়ের কারণে পুহোল ইংল্যান্ডে না গিয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে গিয়ে স্থায়ী হন। সেখানে পাবলিক লাইব্রেরি থেকে ব্রিটিশ মিলিটারির উপর লেখা বিভিন্ন বইপত্র ও ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে এবং ব্রিটিশ ফোন বুক, প্রচারণামূলক চলচ্চিত্র, সামরিক বিজ্ঞাপন প্রভৃতি থেকে তথ্য নিয়ে তার সাথে নিজের কল্পনাশক্তির মিশ্রণ ঘটিয়ে নিজের হোটেল রুমে বসেই তিনি জার্মানদের কাছে একের পর এক এমন বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠাতে থাকেন যে, জার্মানরা সেগুলোকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে থাকে। গুপ্তচরের নেটওয়ার্ক তৈরি করার পরিবর্তে তিনি নিজের কল্পনার জগতেই এক এক করে অন্তত ২৭ জন গুপ্তচর বানিয়ে নেন। তাদের পাঠানো কাল্পনিক রিপোর্টের সাথে সাথে তিনি ব্রিটিশ ট্যুরিস্ট গাইড ও রেলওয়ের ভ্রমণ গাইড ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের কাজে তাদের ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের খরচের বিবরণও জার্মানদের কাছে পাঠাতে থাকেন এবং সে বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থও আদায় করে নিতে থাকেন।
পুহোলের পাঠানো রিপোর্টগুলো ছিল শতভাগ ভুয়া। কিন্তু সেগুলো এত বিস্তারিত এবং বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, জার্মান বাহিনী তার পাঠানো তথ্যগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। জার্মানদের রেডিওতে আড়ি পেতে ব্রিটিশরা যখন জানতে পারে যে, কোনো এক গুপ্তচর ইংল্যান্ডে বসে তাদের সামরিক স্থাপনা, সৈন্যসংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য জার্মানদের কাছে পাচার করছে, তখন তারা সেই গুপ্তচরকে খুঁজে বের করার জন্য বিশাল অভিযান শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে পুহোল যখন মাল্টাতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য অভিযান সংক্রান্ত একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক রিপোর্ট জার্মানদের কাছে পাঠায় এবং জার্মানরাও সে তথ্যের ভিত্তিতে তাদের বিশাল বাহিনী পাঠায় পাল্টা অভিযান চালানোর জন্য, তখনই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে, এই গুপ্তচর তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, যে ইচ্ছাকৃতভাবে জার্মানদেরকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে।
হুয়ান পুহোল গার্সিয়ার স্ত্রী; Source: The National Archives
অবেশেষে ১৯৪২ সালে ব্রিটেনের এমআইসিক্স (MI6) গোয়েন্দারা পুহোলকে খুঁজে বের করে এবং তাকে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসে। পুহোলের স্থান হয় টমাস হ্যারিসনামে এমআইফাইভ (MI5) এর স্প্যানিশ ভাষা জানা এক কর্মকর্তার অধীনে। তার নতুন ছদ্মনাম হয় এজেন্ট গার্বো। ইংল্যান্ডে আসার পর পুহোল তথা গার্বোর কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যায়। কাল্পনিক তথ্যের পরিবর্তে এবার ব্রিটিশরাই তাকে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কিত বিভিন্ন গোপনীয় তথ্য দিতে শুরু করে, যেগুলো সত্য কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ। গার্বো এবং হ্যারিস মিলে যুদ্ধের তিন বছর সময়ব্যাপী জার্মানদের কাছে মোট ৩১৫টি রিপোর্ট পাঠান, যার প্রতিটিতে মোটামুটি ২,০০০ করে শব্দ ছিল। গার্বোর কাল্পনিক এজেন্টদের নেটওয়ার্ক এবং তাদের পাঠানো রিপোর্টগুলো জার্মানদের কাছে এতটাই সন্তোষজনক ছিল যে, তারা ইংল্যান্ডে নতুন কোনো এজেন্ট পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।
ব্রিটিশদের সামরিক অভিযান সম্পর্কে গার্বোর পাঠানো অগ্রীম রিপোর্টগুলো কেন কখনো কাজে লাগে না, সেজন্য অবশ্য গার্বোকে প্রায়ই জার্মানদের কাছে জবাবদিহিতা করতে হতো। তাদেরকে বিশ্বাস করানোর জন্য গার্বো একেক সময় একেক কাহিনী রচনা করতেন। একবার গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিযানের তথ্য পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য গার্বো তার এক কাল্পনিক এজেন্টের অসুস্থতাকে দায়ী করেন। কিন্তু জার্মানরা হয়তো তাকে বিশ্বাস না-ও করতে পারে এরকম আশঙ্কায় তিনি কিছুদিন পর সংবাদ পাঠান যে, অসুস্থতার কারণে ঐ এজেন্ট মৃত্যুবরণ করেছে। তার বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করানোর জন্য এমআইফাইভের উদ্যোগে স্থানীয় একটি পত্রিকায় ঐ কাল্পনিক এজেন্টের মৃত্যুসংবাদও ছাপানো হয়। জার্মানরা শেষপর্যন্ত তাকে বিশ্বাস করে এবং ঐ কাল্পনিক এজেন্টের কাল্পনিক বিধবা স্ত্রীর ভরণ পোষণের জন্য পেনশনও দিতে রাজি হয়।
স্ত্রীর সাথে হুয়ান পুহোল গার্সিয়া; Source: ekonomski.mk
গার্বোর গুরুত্ব অনুধাবন করে জার্মানরা তাকে একটি মূল্যবান রেডিও প্রদান করে, যেন তার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়। রেডিওর মাধ্যমে গার্বো বার্তাগুলো সাংকেতিক ভাষায় মাদ্রিদে পাঠাতেন। এরপর সেখান থেকে জার্মান গোয়েন্দারা বার্তার মর্ম উদ্ধার করে সেটিকে পুনরায় এনিগমা মেশিনের মাধ্যমে কোড করে পাঠিয়ে দিত বার্লিনে নাৎসি বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে। এনিগমা মেশিন ছিল যেকোনো বার্তাকে সাংকেতিক ভাষায় রূপান্তরিত করার সবচেয়ে জটিল যন্ত্র।
ব্রিটিশরা দীর্ঘদিন ধরে জার্মানদের আবিষ্কৃত এ যন্ত্রটি দ্বারা কোড করা তথ্যকে ডিকোড করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না, কারণ প্রতিদিনই এতে নতুন পদ্ধতিতে বার্তা কোড করা হতো। গার্বোর পাঠানো বার্তাগুলো এনিগমা মেশিনের মাধ্যমে প্রেরণ করা হতো বলে যেদিন গার্বো বার্তা পাঠাতেন, ব্রিটিশ গোয়েন্দার সেই বার্তার সূত্র ধরে কখনো কখনো সেদিনের বার্তা ডিকোড করার পদ্ধতি বের করে ফেলতে পারত। যদিও এই সমাধান ছিল সাময়িক, তারপরেও এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা মাঝে মাঝে জার্মান বাহিনীর গোপন তথ্য জানতে পারত।

অপারেশন ফোর্টিচিউড এবং হিটলারের সাথে প্রতারণা

হিটলারের কাছে পাঠানো এজেন্ট গার্বোর বার্তা; Source: BBC
এজেন্ট গার্বোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন ছিল অপারেশন ফোর্টিচিউড, যার মাধ্যমে গার্বো স্বয়ং হিটলারকে ধোঁকাদিয়ে জার্মান বাহিনীর পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৪৪ সালের জানুয়ারিতে জার্মানরা গার্বোকে জানায়, তারা আশঙ্কা করছে মিত্রবাহিনী ইউরোপে বড় ধরনের আক্রমণ করবে। তারা গার্বোকে এ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে এবং রিপোর্ট পাঠাতে নির্দেশ দেয়। জার্মানদের ধারণা ভুল ছিল না। মিত্রবাহিনী সত্যি সত্যিই সে সময়অপারেশন ওভারলর্ডের অধীনে ফ্রান্সে জার্মানদের উপর আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালের ৬ জুন ফ্রান্সের নরম্যান্ডি বিচ আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল সে অভিযানটি। ইতিহাসে এই দিনটি ডি-ডে নামেই বেশি পরিচিত।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনী বুঝতে পেরেছিল, এত বড় আক্রমণের সংবাদ জার্মানদের কাছ থেকে গোপন রাখা কঠিন হবে। তাই তারা গার্বোর মাধ্যমে জার্মানদের কাছে আক্রমণটির অগ্রীম সংবাদ পাঠাতে শুরু করেন। ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ডি-ডে পর্যন্ত গার্বো জার্মানদের কাছে পাঁচশটিরও বেশি রেডিও বার্তা পাঠান, যার মধ্যে অন্তত ৬২টি বার্তা জার্মান হাই কমান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এসব বার্তায় গার্বো জার্মানদেরকে মিত্রবাহিনীর গোপন প্রস্তুতি, সৈন্যসংখ্যা, আক্রমণের সম্ভাব্য তারিখ প্রভৃতি সম্পর্কে অবহিত করতে থাকেন।
১৯৮৪ সালে বাকিংহাম প্যালেসের সামনে পুহোল; Source: The National Archives
কিন্তু অপারেশন ফোর্টিচিউডের আওতায় গার্বো জার্মানদেরকে সত্য তথ্যের পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিথ্যা তথ্য দিতে থাকেন। তিনি জার্মানদেরকে জানাতে থাকেন, মিত্রবাহিনীর মূল আক্রমণটি হবে নরম্যান্ডিতে না, বরং পা-দে-কালেতে। তার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, বিখ্যাত মার্কিন জেনারেল জর্জ প্যাটনের অধীনে ১,৫০,০০০ সৈন্য পা-দে-কালে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গার্বোর পাঠানো তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের উদ্যোগে গার্বোর বর্ণিত এলাকায় লোক দেখানো এয়ারফিল্ড তৈরি করা হয় এবং যুদ্ধজাহাজ, প্লেন ও ট্যাংকের যাতায়াত বৃদ্ধি করা হয়। সেখান থেকে তারা রেডিওতে নিজেদের মধ্যে এমন সব তথ্য আদান-প্রদান করতে থাকে, যা শুনে জার্মান বাহিনী গার্বোর রিপোর্টটিকেই নিশ্চিত সত্য ভেবে বসে।
জার্মান বাহিনীর কাছে গার্বো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজটি পাঠান ডি-ডে’র তিন দিন পর, জুনের ৯ তারিখে। বিশাল সে রিপোর্টে একাধিক এজেন্টের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, নরম্যান্ডিতে আক্রমণ ছিল জার্মান বাহিনীকে পা-দে-কালে থেকে সরিয়ে আনার জন্য মিত্র বাহিনীর একটি প্রচেষ্টা। তিনি দাবি করেন, জেনারেল প্যাটনের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনীর মূল সৈন্যদল তখনও ইংল্যান্ডেই রয়ে গিয়েছিল পা-দে-কালেতে আক্রমণ করার জন্য।
গার্বোর পাঠানো এ রিপোর্ট স্বয়ং হিটলারের কাছে পাঠানো হয় এবং হিটলারও তা বিশ্বাস করেন এবং তার হাইকমান্ডকে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। বিখ্যাত জেনারেল রোমেলের আপত্তি সত্ত্বেও গার্বোর বার্তা দ্বারা প্রভাবিত জার্মান বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ জার্ড ফন রান্ডস্টেড পরবর্তী দুমাস পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যকে পা-দে-কালেতে বসিয়ে রাখেন সম্ভাব্য পরবর্তী আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য। আর এ সুযোগে নরম্যান্ডির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় মিত্র বাহিনী, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের বিজয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

পুরস্কার এবং স্বীকৃতি

Source: Amazon
যদিও গার্বোর দেওয়া তথ্যের কারণেই নরম্যান্ডিতে জার্মানদের পরাজয় ঘটেছিল, কিন্তু জার্মানরা শেষপর্যন্তও তা বুঝতে পারেনি। ১৯৪৪ সালের ২৯ জুন তাকে জানানো হয়, জার্মানীর জন্য বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হিটলারের পক্ষ থেকে তাকে আয়রন ক্রস পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আয়রন ক্রস সাধারণত সম্মুখ সমরে বীরত্বের জন্য হিটলার সশরীরে উপস্থিত হয়ে প্রদান করতেন। কিন্তু গার্বোর বিশেষ অবদানের জন্য সম্মুখ সমরের যোদ্ধা না হওয়া সত্ত্বেও রেডিও বার্তার মাধ্যমে তাকে পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষে পদকটি তার হাতে পৌঁছে।
অন্যদিকে একই বছরের নভেম্বরে তাকে ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জের পক্ষ থেকেএমবিই (MBE: Order of the British Empire) পুরস্কার প্রদান করা হয়। একইসাথে যুদ্ধের দুই বিপরীত পক্ষের কাছ থেকে পুরষ্কার নজির ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। যুদ্ধের পর এজেন্ট টমাস হ্যারিস যখন মার্কিন প্রেসিেন্ট জেনারেল আইজেনহাওয়ারের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন তিনি হ্যারিসকেবলেছিলেন, তার এবং গার্বোর কাজ যুদ্ধে এক ডিভিশন (১০-১৫ হাজার) সৈন্যের চেয়েও বেশি অবদান রেখেছে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ রজার ফ্লিটউড হেসকেথেরমতে, গার্বোর মেসেজই নরম্যান্ডি যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি বদলে দিয়েছিল। ডি-ডে’র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হুয়ান পুহোল তথা গার্বো নিজেকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডাবল এজেন্ট হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছিল।
Source: Amazon
যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত এজেন্ট পুহোল আলোচনার বাইরে ছিলেন। তিনি এমআইফাইভের পরামর্শে নিজের মৃত্যুর কাহিনী সাজিয়ে প্রথমে অ্যাঙ্গোলা এবং পরবর্তীতে ভেনেজুয়ালাতে গিয়ে ভিন্ন পরিচয়ে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ রুপার্ট অ্যালাসন, যিনি নাইজেল ওয়েস্ট ছদ্মনামে গুপ্তচরবৃত্তির উপর লেখালেখি করতেন, তিনি গার্বোর ব্যাপারে আগ্রহী হন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিনি গার্বোকে খুঁজে বের করেন এবং ১৯৮৪ সালে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৮৫ সালে তারা দুজন মিলেOperation GARBO: The Personal Story of the Most Successful Double Agent of World War II শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে এজেন্ট গার্বোর জীবনবৃত্তান্ত উঠে আসে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ তার অপারেশনের তথ্য উন্মুক্ত করে দেয়।
আমাদের পোস্ট টি ভাল লাগলে শেয়ার করুন। 

শনিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৮

হ্যাকাররা কিভাবে পাসওয়ার্ড হ্যাক করে চলুন দেখে নেই।





Featured Image

পাসওয়ার্ড ক্র্যাকিং: হ্যাকাররা যেভাবে বের করে পাসওয়ার্ড


“সন্ত্রাসীদের পরবর্তী একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে ডিজিটাল জগতে, আর তারা ব্যবহার করবে আরো শক্তিশালী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য হ্যাকিং টুলস।”
হ্যাকিংয়ের সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই ইন্টারনেট নির্ভর এই যুগে। অনেকেই হয়তবা ইতোমধ্যেই হ্যাকিংয়ের শিকারও হয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে একটি ডিজিটাল অস্ত্র হ্যাকিং। অনলাইনে নজরদারি, অবৈধভাবে কারো একাউন্টে প্রবেশ কিংবা র‍্যানসামওয়্যারের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের হুমকি থেকে বড় বড় সব সাইবার ক্রাইমে হ্যাকিংয়ের জয়জয়কার। কিন্তু কীভাবে হয় এই হ্যাকিং? হ্যাকাররা কীভাবেই বা বের করে আপনার পাসওয়ার্ড? সহজ পাসওয়ার্ড কেন ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়? আপনার পাসওয়ার্ডটি কি সুরক্ষিত? এসবেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আমরা আজকের এই লেখার মাধ্যমে।
প্রথমেই বলে রাখা ভাল, এই লেখাটি পড়ে আপনি হ্যাকার হয়ে যেতে পারবেন না কিংবা কারো একাউন্ট হ্যাক করে ফেলতে পারবেন না। কেবল আপনাকে পাসওয়ার্ড ক্র্যাকের সামান্য একটু ধারণা দেয়ার উদ্দেশ্যে আজকের এই লেখা। কেন সামান্য? কারণ হ্যাকিংয়ের রয়েছে শত শত উপায় আর প্রকৃত অর্থে হ্যাকিংয়ের নিয়ম বুঝতে চাইলে আপনার চাই কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সিকিউরিটি সম্পর্কে বিস্তর অভিজ্ঞতা আর বিচক্ষণতা।

Source: pcworld

পাসওয়ার্ড ক্র্যাকিং

পাসওয়ার্ড ক্র্যাকিং কী তা জানার আগে জেনে নেয়া যাক ওয়েবসাইটগুলোতে কীভাবে পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করা হয় সেই সম্পর্কে। ওয়েবসাইটে পাসওয়ার্ড সংরক্ষণের অনেক উপায় আছে। হ্যাশিং, সল্টিং, টোকেইন, টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন – এগুলোই বেশি ব্যবহার করা হয়। প্রথমেইহ্যাশিং কী তা একটু জানা যাক। আমরা সাধারণত যেসব শব্দ ব্যবহার করে নতুন পাসওয়ার্ড নির্বাচন করি ঠিক সেভাবে পাসওয়ার্ডগুলোকে ওয়েবসাইটগুলো সংরক্ষণ করে না। এই পাসওয়ার্ডগুলোকে সাইটের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয় একটি বিশেষ এনক্রিপশন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। সেই অ্যালগরিদমকে বলা হ্যাশিং বা হ্যাশ ফাংশন। এই অ্যালগরিদমের কাজ খুবই সাধারণ। আমাদের ইনপুট দেয়া প্লেইন টেক্সট বা সাধারণ অক্ষরগুলোকে এই অ্যালগরিদম একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘের কিছু দুর্বোধ্য কোড বা সংকেতে পরিণত করে। যেমন, abc123 এই পাসওয়ার্ডটির জন্য হ্যাশ হবে e99a18c428cb38d5f260853678922e03 (এমডি৫ হ্যাস অ্যালগরিদম অনুযায়ী)। কিন্তু এই হ্যাশিং আবার পর্যায়ক্রমিক হয় না, যেমন “password” শব্দটির হ্যাশ 5f4dcc3b5aa765d61d8327deb882cf99, কিন্তু “password1” শব্দটির হ্যাস 7c6a180b36896a0a8c02787eeafb0e4c। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাবে কেবল একটি মাত্র শব্দ বেশি ব্যবহারের জন্য। এই হ্যাশ পদ্ধতির জন্য বেশ কিছু জনপ্রিয় অ্যালগরিদম হল এমডি ৫, এসএইচএ ১, এসএইচএ ২ সহ এমন আরো বেশ কিছু। এগুলো হল ওয়ান ওয়ে ফাংশন, যার অর্থ হল পাসওয়ার্ড একবার হ্যাশ করা হয়ে গেলে সেটি থেকে আবার পুনরায় প্লেইন টেক্সট আকারে পাসওয়ার্ড ফেরত পাওয়া যায় না। তাহলে আপনি প্রতিবার লগ ইন করেন কীভাবে? খুব সোজা! প্রতিবার আপনার ইনপুট দেয়া পাসওয়ার্ডকে হ্যাশিং করে সার্ভারে সংরক্ষিত হ্যাশ কোডের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। দুটি হ্যাশই মিলে গেলে আপনাকে লগইন করার অনুমিত দেয়া হয়। আর এই বিশেষ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা হল হ্যাকারদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। কারণ পাসওয়ার্ড ফাইলগুলো জমা রাখা হয় ওয়েবসাইটের সার্ভারে আর সেসব সার্ভার হ্যাক করা যায় এবং পাসওয়ার্ড ফাইলগুলো দেখা যায়। তাই হ্যাকারদের থামানোর জন্য এই পদ্ধতি। কিন্তু তারপরও হ্যাকাররা এই হ্যাশ কোডকে ডিক্রিপ্ট করে ফেলে, আর এটিই হলো পাসওয়ার্ড ক্র্যাকিং। পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করার অনেক উপায় আছে, এখন আমরা দেখব এমন কিছু ক্র্যাকিং পদ্ধতি।

Source : Stack Over Flow

ব্রুটফোর্স অ্যাটাক

হ্যাকার যদি একটি ওয়েবসাইটের সার্ভার থেকে ইউজারদের পাসওয়ার্ড ফাইল সংগ্রহ করে ফেলতেও পারে, তারপরও কিন্তু সে পাসওয়ার্ডগুলো ব্যবহার করতে পারবে না। তার কারণ সেগুলো এনক্রিপ্ট করা। আর এখন কাজে আসবে ব্রুট ফোর্সঅ্যাটাক। ব্রুট ফোর্স অ্যাটাকের ধারণাটাও খুব সহজ। এটি কিন্তু একটি অনুমান নির্ভর প্রক্রিয়া। আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। ব্রুট ফোর্স অ্যাটাকে হ্যাকার একটি সফটওয়্যারের সাহায্য নেয় যেটি একের পর এক পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য পাসওয়ার্ড তৈরী করে তা হ্যাশ করে সার্ভারের হ্যাশের সাথে মিলাতে থাকে। আর এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে সঠিক পাসওয়ার্ডটি মিলে যাবার আগপর্যন্ত।
একটি উদাহরণ দেয়া যাক, যদি হ্যাকারের সফটওয়্যার অনুমান aaaa থেকে শুরু হয় আর তারপর aaab, তারপর aaac এবং এভাবে সেটা zzzz পর্যন্ত পরীক্ষা করে দেখতে থাকবে। এখানে ৪টি অক্ষরের জন্য এমনটা হবে। আর ধীরে ধীরে তার দৈর্ঘ্য কিন্তু বাড়তে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়া চলতে কতটা সময় নেয়?

Source: steemit
আরস টেকনিকা কয়েকজন হ্যাকারকে নিয়ে একটি পরীক্ষা চালায়। সেই পরীক্ষায় একজন সাধারণ হ্যাকার ১০,২৩৩টি পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতে সক্ষম হন, তাতে সময় লাগে মাত্র ১৬ মিনিট। আর তাছাড়া এই প্রক্রিয়া পুরোটা হ্যাকারের উপর নির্ভর করে না, কারণ হ্যাকারের কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার, ইন্টারনেট সংযোগ যত উন্নত হবে, প্রক্রিয়াটি তত দ্রুত কাজ করতে পারবে। কিন্তু পাসওয়ার্ডের অক্ষর সংখ্যা যত বেশি হবে, এতে সময় তত বেশি লাগবে। ব্রুট ফোর্স তাই কাজ করে ৮ অক্ষরের কম পাসওয়ার্ডে।

বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতে যেরকম সময় লাগে; Source : lifehacker

ডিকশনারি অ্যাটাক

ডিকশনারি অ্যাটাককে ব্রুট ফোর্সেরই একটি অংশ বলা চলে। ডিকশনারি অ্যাটাকে সাধারণ কিছু পাসওয়ার্ডের একটি ডিকশনারি তৈরি করে হ্যাকার। এর মাধ্যমে অনেক দ্রুত এবং দুর্বল পাসওয়ার্ডগুলো খুব সহজে ক্র্যাক করে করে ফেলা যায়। কত দ্রুত? ৬.২ বিলিয়নপাসওয়ার্ড ম্যাচ করতে পারে প্রতি সেকেন্ডে। সাধারণ পাসওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে নিজের নাম, কোনো সাধারণ শব্দ বা নিজের নামের সাথে কোনো সংখ্যা এগুলোই। তো আপনি এরকম কিছু পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যাবহার করছেন না তো?
ডিকশনারি অ্যাটাককে আরেকটু কার্যকরী এবং আরেকটু কঠিন পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতে সাহায্য করে হাইব্রিড অ্যাটাক। এর সাহায্যে ডিকশনারি অ্যাটাকে ব্যবহৃত শব্দগুলোকে একটু ভিন্নভাবে সাজানো হয়। সাধারণ শব্দগুলোতে ব্যবহার করা হয় নাম্বার, বিশেষ চিহ্ন ইত্যাদি। যেমন, ডিকশনারি অ্যাটাকে কেবল password123 চেক করলে হাইব্রিড অ্যাটাকে চেক করা হয় p@$$w0rd123, অর্থাৎ a, s, এবং o এর স্থলে ব্যবহার করা হয়েছে @, $ এবং 0 ।

ডিকশনারি অ্যাটাক; Source: techadministrator

রেইনবো টেবিল

নাম শুনে যতটা নিরীহ মনে হয় ততটা নিরীহ নয় এই রেইনবো টেবিল। এতক্ষণ যেসকল প্রক্রিয়ার কথা জানলেন আপনি সেসকল ক্ষেত্রেই প্রথমে একটি পাসওয়ার্ড অনুমান করে সেটিকে হ্যাশ করে সার্ভারের হ্যাশের সাথে মিলিয়ে দেখার কাজটি করাতো হ্যাকার তার সফটওয়্যার দিয়ে। কিন্তু হ্যাশিং করে তা আবার মিলিয়ে দেখতে অনেক সময় অপচয় হয়। তো কেমন হয় যদি কয়েক মিলিয়ন হ্যাশ করা পাসওয়ার্ডের একটি টেবিল পাওয়া যেত! রেইনবো টেবিল সেই চাহিদা পূরণ করে।
অধিক ব্যবহৃত প্রি-হ্যাশড কয়েক মিলিয়ন পাসওয়ার্ড থাকে এই টেবিলে, যার ফলে নতুন করে আর হ্যাশ করা লাগে না হ্যাকারের সফটওয়্যারকে। আর তাছাড়া যেহেতু দুটো হ্যাস মিলে গেলেই হল, তাই হ্যাকারকে আসল পাসওয়ার্ড কী তা জানার দরকারও পড়ে না। প্রায় ৩২ বিলিয়ন পাসওয়ার্ড প্রতি সেকেন্ডে ম্যাচ করতে পারা যায় রেইনবো টেবিলের মাধ্যমে। তো আপনার পাসওয়ার্ড এখন কতটুকু নিরাপদ মনে হচ্ছে!

কিছু ক্র্যাক করা পাসওয়ার্ড; Source : arstechnica

সল্টিং হ্যাশ

না, খাবার লবণের কথা বলছি না। এটাকে পাসওয়ার্ডের লবণ বলা যেতে পারে। কারণ এটি পাসওয়ার্ডের স্বাদ কিছুটা বদলে দেয়। আরেকটু পরিষ্কার করা যাক।
হ্যাশিং করা হয় কেবলমাত্র প্লেইন টেক্সটকে একটি অ্যালগরিদম দ্বারা এনক্রিপ্ট করে। কিন্তু দেখা গেলো এটি বিশেষ সুবিধার নয়। আর তাই সল্টিং করা হয় পাসওয়ার্ড এবং সেটির হ্যাশকে। এটি বেশি জটিল কিছু না, কেবলমাত্র আসল পাসওয়ার্ডের সাথে কয়েকটি অক্ষর জুড়ে এটিকে হ্যাশ করা হয় এবং সেই হ্যাশের সাথে আরো কিছু অক্ষর যোগ করা হয়।
একটি উদাহরণ দেয়া যাক। আপনার পাসওয়ার্ড যদি হয় abc123 (আশা করা যায় বাস্তবেই এটি আপনার পাসওয়ার্ড না), তাকে সল্ট করা হয়। ধরা যাক, সল্ট করার পর এটি হল $2$abc123। এরপর সেটিকে হ্যাশ করে সেই হ্যাশের সাথে আবারো $2$ যোগ করাই হলো সল্টিং হ্যাশ। আর এটি একেক ইউজারের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। এটি হ্যাকারকে বেশ ধীর করে দেয়। কিন্তু ব্রুট ফোর্স আর ডিকশনারি অ্যাটাক এর কিছু ক্ষেত্রে কাজে দিলেও রেইনবো টেবিল কোনোই কাজে আসে না। কারণ এক্ষেত্রে আগে হ্যাকারকে জানতে হয় সল্ট কোথায় যোগ করা হয়েছে, সল্টিং অক্ষরটি কী, কত অক্ষর পর যোগ করা হয়েছে ইত্যাদি।

সল্টিং হ্যাস; Source: packetlife
তাহলে বাঁচার উপায় কী?
প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত হচ্ছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কিন্তু তা-ই বলে বসে নেই হ্যাকাররাও। আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিয়ে তা ব্যবহার করে নিজের লাভের অংশটা বুঝে নেয়ার জন্য হা করে বসে আছে অনেক হ্যাকার। অনেকেই আমরা যে জিনিসটি এড়িয়ে যাই তা হল কঠিন পাসওয়ার্ড নির্বাচন। আবার অনেকেই একাধিক সাইটের জন্য নির্বাচন করি কেবলমাত্র একটি পাসওয়ার্ড, যা হ্যাকারের কাজ অনেকেটাই কমিয়ে দেয়। অনেকেই বার বার ভুলে যায় যে ব্যক্তিগত তথ্যগুলোকে অন্যের থেকে আড়াল করে রাখতে পাসওয়ার্ড মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আপনার ঘরের চাবি কীরকম হবে তা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হলেও ঘরের চাবি চুরির হাত থেকে বাঁচাতে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।
১. কেবলমাত্র পাসওয়ার্ডে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করলেই চলবে না। খেয়াল রাখতে হবে পাসওয়ার্ড যেন সহজ না হয়।
২. সর্বনিম্ন ৮ অক্ষরের পাসওয়ার্ড নির্বাচন করুন। পাসওয়ার্ড যত বড় হবে হ্যাকারের তা বের করতে তত বেশি সময় লাগবে।
৩. প্রয়োজনে বাক্য ব্যবহার করুন। হতে পারে তা কোনো কবিতার চরণ বা গল্পের লাইন কিংবা নিজের বানানো কোনো উক্তি।
৪. প্রতি মাসে অন্তত একবার পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন। একই পাসওয়ার্ড বার বার ব্যবহার করবেন না।
৫. মনে রাখতে সহজ হবে ভেবে সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না। আপনার কাছে যেটা সহজ সেটা হয়ত আগেই কোনো হ্যাকার ক্র্যাক করে রেখেছে।
৬. ভিন্ন ভিন্ন ওয়েবসাইটের জন্য বা ব্যাংক একাউন্টের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পাসওয়ার্ড বা পিন কোড ব্যবহার করুন। ভুলে যাওয়া যদি আপনার অভ্যাস হয় তাহলে আপনার জন্য আছে অনেক পাসওয়ার্ড ম্যানেজার, যেগুলাতে আপনি কেবল একটি পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে সব সাইটের পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন।
সবই তো জানলেন। কিন্তু আপনার পাসওয়ার্ড কতটা জটিল বলে মনে হয়? হ্যাকার কি পারবে আপনারটি ক্র্যাক করতে?

সোমবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৮

সতিই কি চাঁদে গিয়েছিল আমেরিকানরারা?? চলুন জেনে নেই আসল ঘটনা।

নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অল্ড্রিন ও মাইক কলিন্স এনাদের চাঁদের পৃষ্টে অবতরণ কি সত্তই ছিল নাকি নাটক??
“মানুষ আসলে চাঁদে যায়নি। পুরোটাই ছিল আমেরিকার সাজানো নাটক। এরিয়া ফিফটি ওয়ান নামের এক গোপন মরু এলাকায় চাঁদে অবতরণের শুটিং করে সেটাকেই অ্যাপোলো অভিযান নামে চালিয়ে দিয়েছিল মার্কিনিরা। পুরোটাই ভুয়া।” চন্দ্রবিজয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ ও ব্লগ মাধ্যমে খুবই পরিচিত একটি দাবী। অনেকেরই বিশ্বাস এটি একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, এর সম্পূর্ণটাই নাটক।
এর এক কথায় উত্তর হলো- অবশ্যই, ১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মতো আসলেই মানুষ চাঁদে অবতরণ করেছিল। সেটি মোটেও এরিয়া ফিফটি ওয়ানে স্ট্যানলি কুব্রিকের শুটিং ছিল না। শুধু অ্যাপোলো-১১ এর দুজন নন, মোট ১২ জন মানুষ হেঁটেছেন চাঁদে। চাঁদে যাবার বিপক্ষে যে যে অভিযোগগুলো তোলা হয় এখানে সেগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা হবে। বলে রাখা ভালো, চাঁদে মানুষ যায়নি- এ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জনক William Charles Kaysing যিনি ২০০৫ সালে মারা যান।

অভিযোগ ১: চাঁদের মাটিতে পতাকা উড়ছিল, অথচ চাঁদে তো বাতাস নেই

চাঁদে লাগানো পতাকা; Source: NASA
চাঁদের বুকে পতাকার ভিডিওতে দেখা যায়, পতাকা লাগাবার সময় আসলেই সেটি উড়ছে বলে মনে হচ্ছে। চাঁদে যেহেতু বাতাস নেই তাহলে পতাকাকে উড়াচ্ছে কে? পদার্থবিজ্ঞানের সরলতম সূত্র জানা মানুষের পক্ষেও এর কারণ বুঝতে পারা সম্ভব। বায়ুহীন পরিবেশে নড়ার রসদ দিচ্ছে গতি জড়তা। পতাকা লাগাবার সময় যে নড়াচড়া হচ্ছিল তার গতি জড়তার কারণে বায়ু না থাকা সত্ত্বেও পতাকা নড়ছিল একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। ঐ নড়াচড়ার সাথে বায়ুপ্রবাহের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পতাকা বানিয়েছিল Annig Flagmakers, রেয়নের তৈরি সে পতাকার দাম ছিল তখন ৫ ডলার, এখন ৩২ মার্কিন ডলার।
ল্যাবরেটরিতেও বায়ুশূন্য স্থানে পরীক্ষাটি করে দেখা হয়। সেখানেও চাঁদের মতোই ফলাফল। চাঁদের অভিকর্ষের কারণে পতাকা সামান্য সময় পরেই নীচে নেমে যাবে বলে L আকৃতির একটি দণ্ডের সাহায্যে আটকে দেয়া হয়েছিল। বাতাসের বাধা না থাকায় জড়তা একটু বেশি সময় পর্যন্ত বোঝা গিয়েছিল। আর পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে বিবেচনা না করে মানুষেরা সেটিকে ধরে নিয়েছিল বাতাসের প্রবাহ হিসেবে! ভিডিওতে দেখানো পরীক্ষাগারের ঐ পরীক্ষাটি দেখতে পারেন আপনিও।

অভিযোগ ২: চাঁদে তোলা ছবিতে কোনো তারাই দেখা যায় না

নেই কোনো তারা আকাশে; Source: Getty Images
চাঁদেও কিন্তু সকাল হয়! সেখানে আকাশ নীলাভ নয় বাতাস নেই বিধায়, কিন্তু সূর্য তো আছে! যে সময়ে ছবিগুলো তোলা হয়েছিল তখন ছিল চাঁদের দিনের বেলা। সূর্যের আলোতে আকাশের তারকা তখন কীভাবেই বা ধরা পড়বে ছবিতে?
তাছাড়া, এখানে এক্সপোজারের ব্যাপার আছে। যদি আকাশের তারকার ক্ষীণ আলো ধরবার মতো করে এক্সপোজার রাখা হত, তবে দেখা যেত চাঁদের পৃষ্ঠ ও পৃথিবী অনেক সাদা হয়ে গিয়েছে! ক্যামেরার এক্সপোজার নিয়ে যারা ধারণা রাখেন, তারা বিষয়টি ভালো বুঝতে পারবেন।

অভিযোগ ৩: পায়ের ছাপ তো মেলে না!

নিচের ছবিটি দেখিয়ে এই অভিযোগকারীরা বলতে চান যে পায়ের ছাপ মেলেনি।
Source: GooglePlus
আসলে উপরের ছবিতে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা ভেতরের জুতো। অথচ ছাপ তো পরবে বাইরের জুতোর, যেটি আউটার বুট নামে পরিচিত! নিচের চিহ্নিত ছবি দুটোতে দেখুন বাইরের জুতোও আছে।
Source: thrillist.com
Source: collectspace.com
নিচের ছবিগুলোও খেয়াল করে দেখুন।
দেখুন আউটার বুট; Source: NASA
এই হচ্ছে আউটার বুট, এখন প্রদর্শনীতে; Source: NASA
এখানে বুটের তলা আরও স্পষ্ট; Source: NASA
বুটের ছাপ আর বুটের তলা একই ছবিতে দেখা যাচ্ছে; Source: NASA

অভিযোগ ৪: পাথরের ছায়া আর অবতরণ করা মুনল্যান্ডারের ছায়া তো একই দিকে না, অথচ সূর্য তো একটিই!

খেয়াল করুন মুনল্যান্ডারের ছায়া আর পাথরের ছায়া; Source: NASA
উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পাথরের ছায়া কোণাকোণি পড়েছে, যেখানে ঈগল মুনল্যান্ডারের ছায়া পড়েছে সোজাসুজি। আসলে একটি বস্তুর ছায়া আপনি কীরকম দেখতে পাবেন সেটা নির্ভর করে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর, শুধু আলোক উৎসের উপর নয়। এক্ষেত্রে যেটা হয়েছে তা হলো চন্দ্রপৃষ্ঠের বন্ধুরতা। পাথরের ছায়া যেখানে পড়েছে সেখানে জায়গাটা বন্ধুর দেখে ছায়াটাকে সোজা লাগছে না।

অভিযোগ ৫: ছায়াতে এত স্পষ্ট ছবি দেখা যাচ্ছে কেন?

ছায়াতে থাকা এরকম অনেক ছবিতেই সাদা জিনিস বেশি স্পষ্ট দেখা গেছে; Source: NASA
এ ব্যাপারটা চাঁদে তোলা অনেক ছবিতেই দেখা যায়। সূর্য সেখানে প্রধান আলোর উৎস হলেও একমাত্র উৎস নয়, চন্দ্রপৃষ্ঠ নিজেও আলো প্রতিফলন করে ও উৎস হিসেবে কাজ করে, এবং বায়ুমণ্ডল না থাকায় ছবি বেশ স্পষ্ট ও উজ্জ্বল আসে।

অভিযোগ ৬: বাজ অলড্রিনের এই ছবি তুলল কে?

বাজ অলড্রিনের ছবি; Source: NASA
ছবিটা তুলেছিলেন নীল আর্মস্ট্রং। জুম করলে দেখা যাবে, বাজ অলড্রিনের হেলমেটে যে বিম্ব দেখা যাচ্ছে সেখানে নীল আর্মস্ট্রং আছেন, তিনিই ছবি তুলছেন। কিন্তু আর্মস্ট্রংয়ের হাত ওপরে ক্যামেরা ধরার মতো করে নেই। কারণ স্যুটে বুকের কাছে ক্যামেরা ফিক্স করে দেয়া ছিল। তিনি হাত বুকের কাছে এনেছেন ছবি তুলবার জন্য।

অভিযোগ ৭: ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্ট নভোচারীরা কীভাবে পার হলেন?

ভূ-চৌম্বকক্ষেত্রের ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশনবেল্ট পার হয়েই মহাশূন্যে আসতে হয় নভোচারীদের। কোনো শিল্ড ছাড়া কেউ যদি বছরখানেক সেখানে ভ্রমণ করেন তবে ২,৫০০REM পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা ভোগ করতে হবে তাকে। কিন্তু অ্যাপোলো মিশনে তারা এত তাড়াতাড়ি সে অঞ্চল পেরিয়ে গিয়েছিলেন যে আসা-যাওয়া মিলিয়ে তারা মোটে মাত্র ০.৫REM এর মতো তেজস্ক্রিয়তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এমনকি সেটা যদি ২ REM হতো তবেও সেটা নিরাপদ বলা যেত।
ভ্যান অ্যালেন বেল্ট; Source: National Air and Space Museum – Smithsonian Institution

অভিযোগ ৮: যেখানে মডিউল অবতরণ করে, সেখানে কোনো বিস্ফোরণজনিত গর্ত নেই কেন?

অবতরণের সময় লুনার ল্যান্ডার রকেট নিক্ষেপ করে গতি কমাবার জন্য। তাহলে চাঁদের মাটিতে আমরা কেন কোনো বিস্ফোরণ থেকে উৎপন্ন গর্ত দেখতে পাইনি? এর কারণ, ল্যান্ডারের যে রকেট ছিল সেটি ১০,০০০ পাউন্ডের ধাক্কার (থ্রাস্ট) ক্ষমতা রাখত। কিন্তু নামবার জন্য দরকার ছিল মাত্র ৩,০০০ পাউন্ড থ্রাস্ট। নির্গত গ্যাসকে মাটির ঠিক এক জায়গায় গিয়ে আঘাত করবার মতো বায়ুচাপ চাঁদে অনুপস্থিত। হিসেব করে দেখা যায়, সেক্ষেত্রে চাপটা প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ছিল মাত্র দেড় পাউন্ড। গর্ত তৈরি হবার জন্য সেটা মোটেও যথেষ্ট ছিল না। তাছাড়া অবতরণ হয়েছিল নিরেট পাথরে, গর্ত হবার তো প্রশ্নই আসে না।

অভিযোগ ৯: চাঁদে উড্ডয়ন-অবতরণ কোনো ক্ষেত্রেই রকেট থেকে কোনো অগ্নিশিখা দেখা যায়নি কেন?

অ্যাপোলো-১২ নামছে, কোনো অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে না; Source: NASA
হাইড্রাজিন এবং ডাইনাইট্রোজেন টেট্রাঅক্সাইডের মিশ্রণে যে জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছিল সেটার প্রজ্জ্বলনে যে শিখা উৎপন্ন হতো সেটি স্বচ্ছ, এজন্য কোনোঅগ্নিশিখা ‘দেখা’ যায়নি।

অভিযোগ ১০: ধুলোর উপর পায়ের ছাপ এত যত্ন করে সুরক্ষিত মনে হয় কেন?

চাঁদের বুকে পায়ের ছাপ; Source: space.com
এটার উত্তরও বায়ুর অনুপস্থিতি। যে ছাপ সেখানে আছে কোনো বাতাসের অভাবে ধুলোবালি না ওড়াতে সেটি অক্ষতই রয়ে গেছে, এবং সেরকমই থেকে যাবে।

অভিযোগ ১১: চাঁদ থেকে নিয়ে আসা পাথরগুলোর সাথে এন্টার্কটিকা মহাদেশ থেকে আনা কিছু পাথরের এত মিল কেন?

পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ৩০টির মতো পাথর পাওয়া গিয়েছে যা কিনা আসলে চাঁদের অংশ, চাঁদ থেকে ছুটে আসা। উল্কাপিণ্ড মানেই আসলে বহির্জগৎ থেকে ছুটে আসা পাথর। পৃথিবীতে পাওয়া চন্দ্রপাথরগুলো অগ্নিদগ্ধ এবং অক্সিডাইজড। ভূতত্ত্ববিদেরা নিশ্চিত করেছেন যে, নীল আর্মস্ট্রংদের আনা পাথরগুলো আসলেই চাঁদ থেকে আনা।
এন্টার্কটিকা চন্দ্রপাথর; Source: Lunar and Planetary Institute

অভিযোগ ১২: এই C অক্ষরওয়ালা পাথর এলো কীভাবে?

Source: armaghplanet
এটা কিন্তু অ্যাপোলো-১১ নিয়ে কিছু না, বরং অ্যাপোলো-১৬ নিয়ে। এই পাথরের ছবি দেখিয়ে বলা হয়, পাথরের গায়ে C কেন? তার মানে নিশ্চয়ই এটা বানোয়াট। আমরা বরং আসল ছবিটা দেখি যেখানে চার্লস ডিউক লুনার রোভারের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
Source: NASA
এবার জুম করে পাথরটা দেখুন।
Source: NASA
এখন আপনি সহজেই বুঝতে পারছেন, সেই C আসলে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারীদের বানোয়াট একটা ব্যাপার।

অভিযোগ ১৩: নীল আর্মস্ট্রং যদি প্রথম চাঁদে অবতরণকারী হন তবে তার ভিডিও করল কে?

কে এই সাদাকালো ভিডিও করল? Source: NASA
এটার উত্তর এতই সোজা যে এটা নিয়ে প্রশ্ন কেন ওঠে সেটাই রহস্য। নীল আর্মস্ট্রং সিঁড়ি বেয়ে নামবার সময় একবার থেমে একটি ক্যাবল বের করেছিলেন। তখন লুনার মডিউলের পাশ থেকে টিভি ক্যামেরা বেরিয়ে আসে। সরাসরি সম্প্রচারের জন্য এটা করা হয়। অডিও রেকর্ডিং এ এখনো শোনা যায় নীল জিজ্ঞেস করছেন যে সবাই পরিষ্কার ছবি পাচ্ছেন কিনা।
এই সেই ভিডিও ক্যামেরা, লুনার মডিউলের সাথে লাগোয়া; Source: NASA

অভিযোগ ১৪: চাঁদে যদি আসলেই গিয়ে থাকে মানুষ তবে এখন আর যায় না কেন? নিক্সন প্রশাসনের সময়ই কেন যাওয়া হয়েছিল কেবল?

এটা খুবই জনপ্রিয় একটি প্রশ্ন। সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার একটা বিজয় দরকার ছিল, চন্দ্রবিজয়ের দ্বারা সেই ‘স্পেস রেস’-এ জিতে যায় আমেরিকা। বাড়াবাড়ি রকমের অর্থ খরচ হয়ে গিয়েছিল এই প্রতিযোগিতায় জিততে। উভয় পক্ষই বুঝতে পারে যে, পৃথিবীর কক্ষপথে মিশন রাখাই বরং বেশি অর্থসাশ্রয়ী এবং কাজের, চন্দ্রবিজয়ের বাস্তবিক আর কোনো কারণ তেমন ছিল না। তবে চাঁদে এখন আর না যাবার পরিকল্পনা না থাকলেও, মঙ্গল বিজয়ের রূপরেখা কিন্তু বানানো চলছে!
এই গেল মূল অভিযোগগুলোর উত্তর। এবার আমরা নজর দেব নাসার হাত নেই এমন উৎস থেকে আমরা কী করে নিশ্চিত হতে পারি চন্দ্রবিজয়ের ব্যাপারে।
২০০৮ সালে জাপানের Japan Aerospace Exploration Agency (JAXA) থেকে পাঠানো লুনার প্রোব SELENE কিছু ছবি তোলে যা চন্দ্রবিজয়ের প্রমাণ দেয়।
বাঁয়ে অ্যাপোলো-১১ এর তোলা ছবি, ডানে জাপানের SELESE এর তোলা ছবি থেকে থ্রিডি রিকন্সট্রাকশন, একই জায়গার; Source: Wikimedia Commons
চাঁদে মানুষ অবতরণের সবচেয়ে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় LRRR (Laser Ranging Retro-Reflectors) এক্সপেরিমেন্ট। অ্যাপোলো-১১ এর মহাকাশচারীরা চাঁদের মাটিতে ঠিক এভাবে লেজার রিফ্লেকটর রেখে এসেছিলেন।
অ্যাপোলো-১১ এর নভোচারীদের রেখে আসা রিফ্লেক্টর; Source: Wikimedia Commons
পৃথিবী থেকে চাঁদে লেজার নিক্ষেপ করা হলে, ঠিক রিফ্লেকটরে পড়লে নির্দিষ্ট সময়ে আলো ফিরে আসে পৃথিবীতে। Observatoire de la Côte d’Azur, McDonald, Apache Point এবং Haleakalā অবজারভেটরি নিয়মিত এই অ্যাপোলো রিফ্লেক্টর ব্যবহার করে। Lick Observatory ১৯৬৯ সালের ১ আগস্ট নভোচারীদের রেখে আসা রিফ্লেক্টরের অস্তিত্ব এ পরীক্ষার মাধ্যমে খুঁজে পায়। ১৯৭১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অ্যাপোলো-১৪ এর নভোচারীরা রিফ্লেক্টর রেখে আসেন, যা ম্যাকডোনাল্ড অবজার্ভেটরি সেদিনই খুঁজে পায়, অর্থাৎ কোনো মানুষই সেটা সেখানে রেখেছে। অ্যাপোলো-১৫ এর রিফ্লেক্টর রাখা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই এবং কিছুদিনের মাঝেই ম্যাকডোনাল্ড অবজার্ভেটরি সেটা খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। এছাড়া নানা ছবির মাধ্যমেও প্রমাণ পাওয়া যায়।
অ্যাপোলো-১৪ এর নভোচারীদের রেখে আসা রিফ্লেক্টর; Source: Wikimedia Commons
তার চেয়েও বড় কথা, আমেরিকা ছয় ছয় বার চাঁদে মানুষ পাঠাবে, অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন একে ‘নাটক’ জেনেও আমেরিকার ‘গোমর’ ফাঁস করে অপমান করবার চেষ্টা করবে না, এ হতে পারে না। কারণ তারা যে সাপে নেউলের মতো লেগে থাকত তখন একে অন্যের পিছে!
এ লেখাটা হালকা ধাঁচে লেখা হয়েছে যেন যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ পড়ে বুঝতে পারেন, এজন্য বিজ্ঞানের কঠিন ভাষ্যগুলো নিয়ে গভীরে যাওয়া হয়নি।
চন্দ্রবিজয়ীরা কিন্তু বাংলাদেশেও এসেছিলেন, সেটা নিয়ে পড়তে ক্লিক করুন এখানে। তবে আজকের লেখার সারমর্ম এটাই যে, মানুষ চাঁদে গিয়েছিল বটে। একবার নয়, বহুবার। এখন চোখ মঙ্গলের দিকে। বিজ্ঞানের চরম শিখরতার যুগেও চাঁদে যাবার বিষয়কে অস্বীকার আর অবিশ্বাস করে বসাটাই যেন মানবজাতির একটি বড় ব্যর্থতা, তাই নয় কি?